বুধবার আগস্ট ১৩, ২০১৪ শ্রাবণ ২৯, ১৪২১

মধ্যম আয়ের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্থনীতি

ড. এ কে এনামুল হক | ২০১৪-০৮-১৩ ইং

       
মধ্যম আয়ের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্থনীতি

হঠাত্ করেই যেন আকাশটা ভেঙে পড়ল। গত ১৪ জুলাই অসুস্থ বোধ করে ভর্তি হয়েছিলাম রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে। ১৪ জুলাই থেকে ২ আগস্ট মোট ১৯ দিন হাসপাতালে রোগী হিসেবে অবস্থান করার সময় ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্যার পার্থ দাশগুপ্ত একটি ছোট্ট চিরকুটতুল্য ই-মেইল পাঠালেন। লিখলেন, ‘প্রিয় এনাম, অবকাশ বা ছুটি কাটানোর একটি উপায় হলো হাসপাতালে অবস্থান নেয়া। তুমি তা সফলভাবেই করেছ, তবে এখন তাড়াতাড়ি চলে এসো তোমার কাজে যোগ দাও। ঝঅঘউঊঊ -এর কাজেও ।’ চিরকুটটি নানা পথ ঘুরে শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের ই-মেইলের মাধ্যমে আমার কাছে এসেছিল।

স্যার পার্থ দাশগুপ্ত একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও পরিবেশ অর্থনীতিবিদদের সংগঠন ঝঅঘউঊঊ-এর মাধ্যমে। তাই তার এ নিবেদন। তবে চিরকুটটি ভাবিয়ে তুলল। অবকাশ যাপনের একটি সুবিধা হলো, গণ্ডির বাইরে থেকে পৃথিবীকে দেখা। এর মাঝে যেমন রয়েছে আনন্দ, তেমনি রয়েছে ভিন্ন স্বাদ। তাই ঠিক করেছিলাম, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্থনীতি নিয়েই লিখব পরের লেখাটি। লেখার মূল বিষয়বস্তুই নয়, বিষয়টির বিভিন্ন দিক নিয়ে আমি হাসপাতালের আইসিইউতে থেকেই নোট করেছিলাম। এ লেখা সেই নোট থেকেই অনেকাংশে ধার করা।

স্কয়ার হাসপাতাল সম্পূর্ণ বাংলাদেশী  একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে আমার ওপেন হার্ট সার্জন ছিলেন ডা. অপূর্ব কুমার শর্মা। তার সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে ছিলেন ডা. উত্তম কুমার শর্মা, ডা. মফাছি্ছল কিশোর, ডা. হাবিব, ডা. খালেদ মহসীন। বাংলাদেশী ও ভারতীয় ডাক্তারের সমন্ব্বয়ে ছিল একটি চৌকশ দল। তবে হাসপাতালে চিকিত্সকই সব নয়। রোগীর জন্য ওপেন হার্ট সার্জারির পরের স্তর আরো কঠিন। যেখানে প্রয়োজন একদল দক্ষ নার্স। ডাক্তারদের সফলতা সম্পূর্ণভাবে তাদের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে লক্ষ করলাম আরো এক বিচিত্র সমাবেশ। এখানে রয়েছে কেরালা, দার্জিলিং, নেপাল, তামিলনাড়ু ও বাংলাদেশের নার্স। আরো একটি বিষয় লক্ষ করলাম। এদের কেউ গারো, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান; কেউ এসেছে বরিশাল থেকে, কেউ যশোর, পাবনা, গোপালগঞ্জ, কুলাউড়া কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের। সবাই মিলে কাজ করছে অক্লান্তভাবে আর একে অন্যের কাছ থেকে শিখছে। একজন না জানলে দক্ষ আরেকজন শিখিয়ে দিচ্ছে কী করে সেবা দিতে হয়। বিষয়টি মনে রাখার মতো।

২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি ডাটা অনুযায়ী বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য খাতে খরচ ২৬ দশমিক ৫৪ ডলার। এর ৩৩ শতাংশ সরকারি, বাকিটুকু বেসরকারি। এতে হাসপাতাল খরচ ছাড়াও রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা, ওষুধ বা পথ্য, পুষ্টি, এমনকি পানি ও পয়োনিষ্কাশনের খরচ। সবকিছুই আমাদের দেশের জন্য স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত খরচ। আরো কিছু তথ্য দিই, দেশে প্রতি ২০০০ লোকের জন্য রয়েছে একজন চিকিত্সক, প্রতি ৩০০০ জনের জন্য একটি হাসপাতাল বেড ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় আয় প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় উত্পাদনের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা। এই ২১ হাজার কোটি টাকার প্রায় ২-৩ অংশ খরচ করে জনগণ নিজেদের পকেট থেকে আর বাকিটুকু সরকারি তহবিল থেকে। মাথাপিছু খরচ বছরে মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকার মতো। এ টাকায় কী চিকিত্সা সম্ভব তা সহজেই অনুমান করতে পারবেন। তবে বিষয়টি এখানে নয়। যে কয়েকটি কারণে আমি এসব পরিসংখ্যান উপস্থাপন করছি তা নিম্নরূপ—

১. বাংলাদেশ ক্রমে দ্রুততার সঙ্গে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে বলেই আমরা সবাই আশা করছি। কী আছে এই মধ্যম আয়ের দেশে? মাথাপিছু গড় আয় নিশ্চয়ই বাড়বে? আয়বৈষম্যও বাড়বে নিশ্চিত। দেশ দ্রুততম সময়ে বিভাজিত জাতিতে পরিণত হবে। একদলের থাকবে অনেক কিছু, অন্যদের তেমন নয়। একদল চিকিত্সার জন্য যাবে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদল মাথাপিছু কয়েকশ টাকা খরচ করতে গিয়ে অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হবে। বিষয়টি ভাবার মতো। এ অবস্থা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই আমাদের এখনই ভাবতে হবে কী করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক ও গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন আনা যায়।

এ ব্যাপারে বেশ কয়েক ধরনের ব্যবস্থাপনা বিশ্বে প্রচলিত— ক. সার্বজনীন অবৈতনিক চিকিত্সাসেবা, খ. সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্পমূল্যে চিকিত্সাসেবা, গ. বেসরকারি চিকিত্সাসেবা এবং ঘ. সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে চিকিত্সাসেবার বিস্তার ঘটানো। যেসব দেশে প্রচুর পরিমাণ চিকিত্সা অবকাঠামো, চিকিত্সক ও সেবাদানকারী শ্রম বিদ্যমান, তাদের অনেক দেশেই প্রথম দুটো ব্যবস্থা প্রসার লাভ করেছে। কারণ অন্তত সরকারের পক্ষে সেবার বন্দোবস্ত করা সম্ভব। ভারতেও এটি সম্ভব হয়েছে। কারণ সেখানেও রয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, চিকিত্সক কিংবা শুশ্রূষাকারী নার্স। এটি সম্ভব হয়েছে ভারতে প্রাদেশিক সরকার কাঠামোতে চিকিত্সা ব্যবস্থাকে সাজানোর ফলে। ভারতে তাই প্রদেশভেদে গড়ে উঠেছে চিকিত্সা অবকাঠামো। চিকিত্সক সৃষ্টিও কিন্তু প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা চালু থাকায় কোনো প্রতিযোগিতা নেই, তাই চিকিত্সক তৈরিতে আমরা আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারিনি। পারিনি আঞ্চলিক উপযোগিতা অনুযায়ী চিকিত্সা অবকাঠামো বিস্তার করতে। সবকিছু এখন ঢাকায়। ঢাকার ২০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই সীমিত রয়েছে সরকারি সব উদ্যোগ। সব পেশাজীবী ঢাকাকেন্দ্রিক। কারণ ঢাকাই চিকিত্সা ব্যবস্থাপনার প্রাণবিন্দু। কেউই ঢাকা ছাড়তে চাইছেন না। অথচ বিভাগীয় ভিত্তিতে চিকিত্সা ব্যবস্থাপনাকে পৃথক ও বিকেন্দ্রিক করা হলে অন্তত বিভাগ ভিত্তিতে কিছু অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হতো। অবশ্য আমি বিভাগীয় বিকেন্দ্রীকরণ বলতে বোঝাচ্ছি সেই ব্যবস্থা, যেখানে নিয়োগসহ সব সিদ্ধান্তই বিভাগ ভিত্তিতে হবে। কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিত্সা ব্যবস্থা শিগগিরই বন্ধ হবে।

চিকিত্সা ব্যবস্থাপনায় আরেকটি পরিবর্তন সরকার গ্রহণ করেছে তা হলো, বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল সৃষ্টিতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করা। দেশের বাইরে গিয়ে চিকিত্সা গ্রহণ ক্রমে একশ্রেণীর বাংলাদেশীদের অবসেশনে পরিণত হয়েছে। চিকিত্সাসেবার মাধ্যমে ভারত বছরে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি রুপি আয় করছে, যার এক বিশাল অংশ বাংলাদেশ থেকেই যায়। ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুরের কথা বাদই দিলাম। প্রতি বছর এই বিশাল পরিমাণ অর্থ সাধারণ চিকিত্সার নামে দেশ থেকে চলে যাওয়া বন্ধ করতে হলে দেশেই সৃষ্টি করতে হবে প্রতিযোগিতামূলক চিকিত্সাসেবা। এজন্য প্রয়োজন গোটা চিকিত্সাসেবাকে বিভাজন করা।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার আমদানি কমিয়েছে, তেমনি প্রয়োজন চিকিত্সা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন। হঠাত্ করে আমাদের পক্ষে হাজার হাজার চিকিত্সক বা নার্স সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না, তবে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে হঠাত্ করেই উন্নত মানের চিকিত্সা অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। প্রশ্ন আসতে পারে, এর ফলে কি সবাই সমান চিকিত্সা পাবে? উত্তর না, তবে সৃষ্টি করা যেতে পারে সুযোগ। যেমন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকার একটি নিয়ম চালু করেছে, তা হলো— ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে বিনা বেতনে পড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। বুঝতেই পারছেন যে, অন্তত কিছু লোক তাহলে সিঙ্গাপুরে না গিয়েও উন্নত সেবা পেতে পারে। আরেকটি বিষয় ভাবার মতো, বেসরকারি চিকিত্সা ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সেবা থাকে, যার একটির দাম দিয়ে অন্যটিকে সহজলভ্য করা হয়। দেশের উচ্চশিক্ষায় প্রায় একই রকম ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে চিকিত্সাসেবা দেশে সহজলভ্য হবে।

২. চিকিত্সাসেবার সুযোগ বিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, অপর্যাপ্তসংখ্যক চিকিত্সক ও নার্স। তদুপরি দক্ষ চিকিত্সক ও নার্সের বাধা আরো বেশি। দুঃখজনক হলো, চিকিত্সকরা সাধারণত নিজেরা অন্য দেশে গিয়ে চিকিত্সাসেবা দিতে আগ্রহী হলেও দেশে চিকিত্সক এনে উন্নত চিকিত্সার সুযোগ সৃষ্টিতে বাধা দিয়ে আসছেন। তাদের কি ধারণা বিদেশী চিকিত্সক দেশে এলে তাদের অবারিত সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে? মোটেই তা হবে না। বরং ভালো বিদেশী চিকিত্সকদের এ দেশে এসে চিকিত্সাসেবা দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলে দেখা যাবে, শিগগিরই দেশের চিকিত্সক তা শিখে নিতে পারবেন। নিজেরাই তখন তাদের প্রতিযোগী হবেন। আমাদের চিকিত্সকদের পক্ষে তা সম্ভব বলেই আমার বিশ্বাস। একই কথা সত্য নার্সদের ক্ষেত্রেও।

সর্বোপরি মনে রাখতে হবে বাংলাদেশী চিকিত্সকরা যেমন সারা জীবনের জন্য লিবিয়া বা ইরাকে গিয়ে থাকেননি, তেমনি বিদেশী চিকিত্সকরাও সারা জীবনের জন্য এ দেশে থাকবেন না। তারা আসবেন নির্দিষ্ট সময়, সাধারণত ৮-১০ বছরের জন্য আর তাদের সংস্পর্শে এসে এ দেশে চিকিত্সার এক নতুন মান তৈরি হবে। বাংলাদেশও হতে পারবে পৃথিবীর বহু দেশের বহু জাতির জন্য চিকিত্সাসেবার স্থান। স্বাস্থ্যসেবা রফতানি হবে আমাদের এক নতুন পণ্য।

 

লেখক: অর্থনীতির অধ্যাপক

এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের পরিচালক


© 2011-2014
সম্পাদক ও প্রকাশক: দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বিডিবিএল ভবন (লেভেল ১৭), ১২ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ই-মেইল: news@bonikbarta.com বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ পিএবিএক্স: ৮১৮৯৬২২-২৩, ফ্যাক্স: ৮১৮৯৬১৯
close