বুধবার,ডিসেম্বর ১০, অগ্রহায়ণ ২৬, ১৪২১

নীড়পাতা

বিশেষ সংখ্যা

কৃতী মুখ

আমার দেখা ওয়াহিদ স্যার

এ কে এনামুল হক | ২০১৪-১২-১০ ইং

   
  Share  
আমার দেখা ওয়াহিদ স্যার

প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বা ওয়াহিদ স্যার আমাদের কারো অজানা নাম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা শেষে বর্তমানে আমাদের সঙ্গে রয়েছেন ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ নিয়ে। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সম্ভবত ১৯৯৪ সালে। আমার চাকরির সাক্ষাত্কারে তিনি ছিলেন একজন পরীক্ষক। সাক্ষাত্কারের প্রশ্ন এখন মনে নেই, তবে মনে আছে যে, সাক্ষাত্কারের পর তিনি ঘাবড়ে দিয়েছিলেন আমাদের উপাচার্যকে। বলেছিলেন, তাকে আপনি বেশি দিন রাখতে পারবেন না। [বিষয়টি পরে উপাচার্য মহোদয়ই আমাকে বলেছিলেন]। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, আমি আসলেই কোথাও বেশি দিন থাকিনি। পর পর অনেক চাকরি করেছি। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়েছি, আর বারবারই মনে হয়েছে কেন তিনি তা বলেছিলেন।

এর পর নানা কাজে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সবসময়ই তা ছিল একাডেমিক ব্যাপার নিয়ে। প্রতিবারই তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে। সহজে অবস্থার ব্যাখ্যা করায় তার দক্ষতা মনে রাখার মতো। একবার আমরা বেশ ক’জন অর্থনীতিবিদ তার বাসায় বসেছি রিসার্চ গ্রুপের আড্ডায়। সরকার তখন পেট্রলের দাম বাড়িয়েছে মাত্র। চারিদিকে হই চই চলছে। অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। আমাদের অনেক বন্ধু রীতিমতো সংবাদপত্রে ঝড় বইয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন, বিষয়টি তার বোধগম্য হচ্ছে না। দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে ভোক্তার অবস্থান আমরা তাত্ত্বিকভাবে জানি। তাহলে কি দাম কমানোটা ভালো? অনেকেই স্বাভাবিকভাবে ভাববেন যে, ভোক্তার জন্য দাম কমানোই তো ভালো। কিন্তু ওয়াহিদ স্যার পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি দাম শূন্য হলে আরো ভালো হয় না? বুঝতে পারলাম, আমাদের অনেক বন্ধুই বাজারমূল্য নির্ধারণের প্রকৃত ব্যাখ্যা না ভেবে কেবল ক্রেতার স্বার্থে তাদের অবস্থান নিয়েছেন। হয়তোবা তারা নিজেরাও ক্রেতা তাই। ওয়াহিদ স্যার যোগ করলেন, তার প্রশ্ন শুনে যদি আমাদের অবস্থান এই হয় যে, দাম বাড়ানো যেমন ভালো নয়, তেমনি দাম কমানোও ভালো নয় [কারণ উত্পাদন বা জোগান থাকবে না], তাহলে আগের অর্থমন্ত্রীর চেয়ে ভালো অর্থনীতিবিদ এ দেশে আর হয় না। কারণ তিনি আর যা-ই হোক না কেন অর্থনীতির ভাষায় অপটিমাম বা যথার্থ দামই নির্ধারণ করে যেতে পেরেছিলেন! যারা অর্থনীতি জানেন তারা বুঝতেই পারছেন যে, বাজার দাম নির্ধারণ তত্ত্ব কতটা সহজে তিনি বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছেন দাম বাড়া বা কমা ভালো না মন্দ, তা ক্রেতার চোখের দিতে তাকিয়ে বলা যায় না। দাম নির্ধারিত হয় চাহিদা ও জোগান দ্বারা। অতি সাধারণ বিষয় অনেকের চোখেই ধরা পড়েনি বলেই সমালোচনা চলছিল।

আমরা তখন ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের গঠন নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের হাতে বেশ ক’টি সংস্থার গঠনতন্ত্র। কী করে গ্রুপটি তৈরি করা যায়, আমাদের উদ্দেশ্য কী ইত্যাদি ইত্যাদি। একসময় ওয়াহিদ স্যার বলে বসলেন, তিনি সোসাইটি আইনে নিবন্ধন করার বিরোধী। বিষয়টির পেছনের কারণ তখনো স্পষ্ট ছিল না আমার কাছে। জানতে চাইলাম কেন? সবাই তো সোসাইটি আইনের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছে? আমরা কোন আইনে করব? বললেন, আমরা কোম্পানি আইনে করি না কেন? কী লাভ এতে? লাভ অনেক তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ আইনের আওতায় প্রতি বছর সংগঠনের আর্থিক প্রতিবেদন রেজিস্ট্রার অব কোম্পানির কাছে জমা দিতে হয়। এতে স্বচ্ছতা বাড়ে। স্বচ্ছ সংগঠন তৈরির স্বার্থে আমাদের কোম্পানি আইনের আওতায় থাকা উচিত। কথাটি মনে ধরেছিল। আমরা শেষ পর্যন্ত কোম্পানি আইনের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছিলাম। তবে এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার নিজের অনেক উপকার হয়েছিল। আমি আইন দুটিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছিলাম।

বিষয়টি নিয়ে আমার নিজের ব্যাখ্যাটাও এ প্রসঙ্গে দিয়ে রাখা ভালো। সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০ সালের মুখবন্ধে লিখা আছে— WHEREAS it is expedient that provision should be made for improving the legal condition of societies established for the promotion of literature, science, or the fine arts, or for the diffusion of useful knowledge, the diffusion of political education or for charitable purposes. আমার মতে, এ মুখবন্ধেই রয়েছে কেন সোসাইটিজ অ্যাক্ট প্রণীত হয়েছিল। সামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে সমাজে সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা কিংবা জ্ঞানচর্চার জন্য বা রাজনৈতিক শিক্ষা প্রচারের জন্য বা দাতব্য কাজের জন্য এ আইন প্রণীত। ফলে এ আইনের আওতায় গঠিত সংগঠনগুলোয় সরকারের কর্তৃত্ব থাকে খুব কম। এ আইনের আওতায় ব্রিটিশ সরকারের সময়ই নানা সংগঠনের জন্ম হয়। সেখানে সরকার খুব কমই হস্তক্ষেপ করতেন। এ আইনের আওতায় গঠিত সংগঠন সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডেও রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবে বলেই এখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল সবচেয়ে কম। অথচ আমরা এর সুযোগ নিয়ে তৈরি করেছি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এমনকি চালু করেছি বীমা কার্যক্রম। ফলে প্রতিনিয়ত সরকার এ আইনের আওতায় গঠিত সংগঠনের ওপর নজরদারি বাড়াচ্ছে। বাড়ছে অনিয়ম আর সেই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে প্রকৃত সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা বিজ্ঞানচর্চার কার্যক্রম। সরকারি যেসব সংস্থা এসব নজরদারিতে ব্যস্ত, তাদের দাপটে প্রকৃত সংগঠনগুলো পিছু হটছে। আমাদের অবিবেচিত কার্যক্রমের ফলে আজ প্রকৃত সামাজিক সংগঠন তৈরির কার্যক্রম অনেকটা স্তিমিত। আমার মতে, সরকারের উচিত এনজিও-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করা। এবং সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমে সরকারি নজরদারি কমিয়ে দেয়া। সমাজে যতটা চিন্তার বৈচিত্র্য থাকবে, যতটা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র তৈরি হবে, সমাজ ততটাই বিকশিত হবে। তাই এ সুযোগ তৈরির স্বার্থেই এনজিও কার্যক্রমের জন্য পৃথক আইন তৈরি করা উচিত। বলা বাহুল্য, আমার এ চিন্তার সূত্র ছিলেন ওয়াহিদ স্যার।

আরো একবার আমরা ভাবছিলাম আমাদের গ্রুপের আয়কর বিষয়ে। আমাদের অনেকের মতে, আমরা প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ কর দিয়ে থাকি। তা একটু বেশি। কেউ কেউ জোরালো বক্তব্য দিচ্ছিলেন কী করে কর রেয়াত পাওয়া যায়। নানা সংগঠনের উদাহরণ আসছিল আমাদের সামনে। অমুক সংস্থা কোনো কর দেয় না অথচ আমাদের মতোই কার্যক্রম! অমুক সংস্থা কর রেয়াতের সুবিধা পায়, আমরাও কেন আবেদন করি না। ওয়াহিদ স্যার অনেকটা দ্বিধান্বিত। কী করা যায়! একই ধরনের কার্যক্রম অথচ আমরা কর দিই, অন্যরা দেয় না। সব শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না কী করা যায়। পরবর্তী সভায় বিষয়টি সাব্যস্ত হলো, আমরা কর রেয়াতের সুবিধা নিয়ে এনবিআরে কোনো দেন-দরবার করব না।

ওয়াহিদ স্যারকে আরো একবার আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিতে। তখন স্যার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। সভা শেষে এক বন্ধু স্যারকে বললেন, এ কী কথা শুনি চারদিকে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক শিক্ষক নাকি পরীক্ষার প্রশ্ন অর্থের বিনিময়ে ছাত্রদের দেন আবার প্রশ্ন পরীক্ষায় না এলে টাকা ফেরতও দেন! আমার কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ অজানা ছিল। স্যার লজ্জায় অবনত হলেন আর বললেন, অপেক্ষা কর আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিষয়টি আমার কানেও এসেছে। কিছুদিন পর দেখলাম, সত্যি সত্যি ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। স্যারকে ধন্যবাদ। চারদিকে প্রশ্নফাঁস খবরের মধ্যে এ খবর শুনে পাঠকরা নিশ্চয় আনন্দিত হবেন।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ


© 2011-2014
সম্পাদক ও প্রকাশক: দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বিডিবিএল ভবন (লেভেল ১৭), ১২ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ই-মেইল: news@bonikbarta.com বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ পিএবিএক্স: ৮১৮৯৬২২-২৩, ফ্যাক্স: ৮১৮৯৬১৯