বুধবার,ফেব্রুয়ারি ২৫, ফাল্গুন ১৩, ১৪২১

সৌরবিদ্যুতের অর্থনীতি

ড. এ কে এনামুল হক | ২০১৫-০২-২৫ ইং

   
  Share  
সৌরবিদ্যুতের অর্থনীতি

বিদ্যুৎ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। একসময় বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল কেবল বিত্তশালীদের ব্যাপার। বেশি দিন নয়, প্রায় ২০০ বছর আগেও মানবসভ্যতা বিদ্যুৎ ব্যবহারে অতটা পটু ছিল না। বিদ্যুৎ মানে আলো। আলোর ব্যবহার আমাদের কাজের সময়কে দিন গড়িয়ে রাতে নিয়ে গেছে। তাই সভ্যতার সূচনা থেকেই আলো আমাদের প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। একসময় আলোর উত্স ছিল তিমির মাথার খোলের ভেতরকার মোম। নিতান্ত দুর্ঘটনাবশত এর আবিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ওই মোমের আলোয় ছিল না কোনো ধোঁয়া। আলোও ছিল উজ্জ্বল। তাই তিমি শিকার করে তেল সংগ্রহ করা ছিল একশ্রেণীর মানুষের পেশা। একটি তিমির মাথার খোলে প্রায় ৫০০ গ্যালন মোম পাওয়া যেত। এ মোম সংগ্রহ করতে গিয়ে তিমি মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময়ই আবিষ্কার হয় কেরোসিন। আলোর এক নতুন আধার আবিষ্কৃত হওয়ায় বেঁচে যায় তিমি!

এবারের আবিষ্কারের ফলাফল ছিল বৈপ্লবিক। যে আলো একদা ছিল ধনী শ্রেণীর বিলাসিতা, তা ক্রমে সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গীতে পরিণত হয়। কেরোসিন জনজীবনে সাধারণ একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়। সবার চাই কেরোসিন। মাটির গভীরে লুক্কায়িত এ সম্পদের ব্যাপক ব্যবহার পৃথিবীকে বদলে দেয়। অন্ধকার পৃথিবী ক্রমে আলোকিত হয়ে ওঠে। তবে এখানেই শেষ নয়। আসেন থমাস আলভা এডিসন। তার আবিষ্কার (এডিসনের আগেই বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়, তবে তিনি তা প্রথম বাজারে নিয়ে আসেন) মূলত আলোর সমীকরণ পাল্টে দেয়। তিনি বাণিজ্যিকভাবে বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন করেন। তার ফলে গোটা পৃথিবী রাতের আঁধার থেকে মুক্ত হয়। এডিসনের আবিষ্কার পৃথিবীতে জন্ম দেয় নতুন নেশার। বিদ্যুতের নেশা। কী করে আরো অধিক বিদ্যুৎ উত্পাদন করা যায়, তাই হয়ে ওঠে নতুন এক নেশা, নতুন পেশা।

কতভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়, তা জানার অদম্য আগ্রহ থেকেই আবিষ্কৃত হয় নানা ধরনের বিদ্যুৎ। প্রায় সমুদ্র মন্থনের মতো অবস্থা। পাহাড়ি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরির ব্যবস্থায় তৈরি হয় জলবিদ্যুৎ। এ আবিষ্কারের ফলে এবার নাজেহাল হয় শুধু তিমি মাছ নয়, স্বয়ং মানবসভ্যতাও। লাখ লাখ মানুষ তার আবাসস্থল হারায়। কারণ তা জলে তলিয়ে গেছে! সবচেয়ে ভালো কৃষিজমিও চলে যায় জলের গভীরে। হাজার বছরের গড়ে ওঠা সংস্কৃতি হাওয়ায় মিশে যায়। কারণ গোটা সম্প্রদায়ের জমি চলে গেছে পানির নিচে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে শক্ত আন্দোলন। বিশ্বব্যাপী তাই বাঁধ নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ বিদ্যুৎ আমাদের চাই। আমার এক অধ্যাপক বন্ধু তো (যিনি একজন খ্যাতনামা পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলীও) বলেই বসলেন, বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য আমাদের জানা উচিত রসায়ন ও জীববিজ্ঞান। কী করে ইল মাছ লেজের এক ঝাপটায় ১০০০ ভল্ট বিদ্যুৎ উত্পাদন করে— তার রহস্যভেদ করলেই নাকি বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হবে সবচেয়ে কম খরচে ও সবচেয়ে কম ক্ষতিকর উপায়ে।

আবিষ্কার হয় তাপবিদ্যুৎ। জ্বালানো হয় কয়লা, পেট্রল বা ডিজেলজাতীয় দাহ্য পদার্থ। এ আবিষ্কারও পৃথিবীতে ব্যাপক প্রসার লাভ করে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই তাপবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে। কিন্তু বেশি দিন না যেতেই ধরা পড়ে ভেতরের যন্ত্রণা! তাপবিদ্যুতে কয়লা বা এ জাতীয় জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আসে নতুন উপদ্রব এসিড বৃষ্টি। ফলে বাতাসে সালফারের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আলোর অসুবিধা হয় না বটে, তবে বিপদে পড়েন কৃষক। কৃষকের জমি হয়ে যায় অকেজো। তাই আবারো বিপদগ্রস্ত হয় মানবসভ্যতা। কৃষিকাজ আমাদের আধুনিক সভ্যতার প্রথম প্রকাশ। কৃষিকাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মানুষ শিকার বা কুড়িয়ে খাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছিল! আলো আমাদের সেই মূলে আঘাত হানছে। কিন্তু আলো আমাদের প্রয়োজন।

আবিষ্কারের নেশা আরো বেড়ে যায়। এবার আবিষ্কার হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ। জটিল তার উত্পাদন ব্যবস্থা, কিন্তু সস্তা তার বিদ্যুৎ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ আছে বলেই পাশ্চাত্য এখনো আমাদের সঙ্গে কৃষি ও শিল্পোত্পাদনে প্রতিযোগিতা করার শক্তি রাখে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আলোর আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে হারিয়ে যায় আমাদের কৃষির আদিমতম উপাদান লাঙল। এখানে এসেছে পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার ইত্যাদি। পারমাণবিক বিদ্যুৎ সস্তা হওয়ায় পাশ্চাত্যের শিল্পোত্পাদন তাদের প্রাধান্য বহুদিন বজায় রাখতে পেরেছিল। তবে এ বিদ্যুৎও আঘাত হানে আমাদের অস্তিত্বে। জাপানের ফুকুশিমা কিংবা ইউক্রেনের চেরনোবিলের দুর্ঘটনা আবারো মনে করিয়ে দেয় যে, আলোর নিচেই রয়েছে ভয়ঙ্কর অন্ধকার। মানবসভ্যতাও বিলুপ্ত হতে পারে— এমন অঘটন কেবল পারমাণবিক বিদ্যুতের দ্বারাই সম্ভব!

এতসব অন্ধকারের মধ্যে বাংলাদেশে লাখ লাখ ঘরে আলো জ্বলছে। কারা এ আলো জ্বালাচ্ছে? কিসের আলো? এ নিয়েই আজকের এ নিবন্ধ। এ আলো সৌরবিদ্যুতের। এ যাবৎ প্রায় ২০ লাখ বাড়িতে এ আলো পৌঁছে গেছে। তবে সবাই এ আলো ব্যবহার করছে না। দিবারাত্রি পরিক্রমায় প্রতিদিন ৬ ঘণ্টার বেশি সূর্যের আলো থাকলেই সৌরবিদ্যুৎ উত্পাদন করা সম্ভব। অনেকে বলেন প্রকৃতির দয়া। সূর্যকে দেবতা মনে করার একটি নতুন কারণ যোগ হলো।

এমন এক আলো কিন্তু সবাই ব্যবহার করছে না। এ আলোর খরচ বেশি। তাই বিদ্যুৎ বিকাশের ইতিহাস জানা থাকলে এ আলো কিন্তু ধনীদের ব্যবহার করার কথা। মজার ব্যাপার, এ অতীব মূল্যবান আলো জ্বলছে বাংলাদেশের অজো পাড়াগাঁয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাড়িতে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এখনো এর থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে। দেশের আনাচে-কানাচে যেখানে ‘সরকারি আলো বা বিদ্যুৎ’ পৌঁছবে না, সেখানকার গরিব জনগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছে, অন্ধকার দূর করে আলোর দেখা পেতে আরো অনেক দেরি। সরকারি বিদ্যুৎ তাদের কপালে নেই। তাই তারা নীরবে করেছে একটি বিপ্লব। বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতে সবচেয়ে আলোকিত দেশ।

এ আলো তারা দান-খয়রাতের মাধ্যমে পায়নি। পেয়েছে নিজেদের ইচ্ছা ও ক্ষমতার দ্বারা। বেশ কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম কক্সবাজারের একটি গ্রামে। গ্রামটিতে বিদেশী অর্থে নানা উন্নয়নকাজ চলছিল। আমার দায়িত্ব ছিল তা দেখে মতামত দেয়া। গ্রামবাসীর সঙ্গে গল্প করছি। তাদের সুখ-দুঃখের গল্প। এর মধ্যে একজন বলে বসল, স্যার! আমাদের গ্রামে সোলার দেয়ার জন্য বলে দেন। কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? হেসে বলল, বিদ্যুৎ এলে আরাম হবে। বললাম সোলার কেন? উত্তর, সরকারি বিদ্যুৎ আসবে না স্যার। আমরা খবর নিয়েছি। বুঝতেই পারছেন, গ্রামবাংলার জনগণ সরকারের ক্ষমতা কিংবা পরিকল্পনা সবই জানে। তাই তারা দামি বিদ্যুৎ চায়, জীবনে আরাম কে না চায়?

আরো কিছুদিন পরের কথা। গাইবান্ধায় যমুনার চরে গেছি। বিশাল চর। আলোহীন জগৎ। সন্ধ্যা হলেই নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করছি। একই আবেদন, স্যার! সোলার আনার জন্য বলে দেন।

এই থেকে সোলারের গল্প জানতে আমারও ইচ্ছে হলো। গল্পটির দুটি ভাগ। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে। দ্বিতীয়টি আমার নিজস্ব। গ্রামগঞ্জে ঘুরতে গিয়ে আমার অনুধাবন। কিন্তু আমি বিচলিত এবং চিন্তিত।

বিশ্বব্যাংকের ৯০ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনের আমি নিজেও একজন লেখক। সম্প্রতি সেটি প্রকাশ হয়েছে। কৌশিক বসু বইটির মুখবন্ধে লিখেছেন, কেরোসিনের বদলে সৌরবিদ্যুতের আলো অনেক সস্তা। সৌরবিদ্যুতের আলোর চেয়ে কেরোসিনের আলো প্রায় ৩৫ গুণ বেশি দামি। শুধু তাই নয়, সৌরবাতির ঘর অনেক বেশি সময় আলোকিত থাকে। প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি সময় ঘরে আলো থাকে। এছাড়া বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়।

দেশের সব বিদ্যুত্হীন ঘর সৌরবিদ্যুৎ দ্বারা আলোকিত করা হলে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং এ কার্বন যদি বিক্রয় করা হয়, তবে আজকের দামে বছরে দায় হবে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বলা বাহুল্য, এখন যেখানে কার্বন টনপ্রতি ৩-৪ ডলার দরে বিক্রয় হচ্ছে, একসময় তা ৭০ ডলারেও বিক্রয় করা হয়েছিল। টাকার হিসাবে আজকের দাম কম মনে হলেও গরিবের খাতার অঙ্কে তা কিন্তু অনেক।

আমাদের এ গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ এখনো গ্রামের হতদরিদ্রদের বাড়িতে যায়নি। তবে যারা নিয়েছে, তারা হতদরিদ্র না হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীরই অংশ। সৌরবিদ্যুতের আলো যে বাড়িতে এসেছে, সে বাড়ির জ্ঞানের আলোও বেড়েছে। শিক্ষায় সোলার বাতির প্রভাব লক্ষণীয়। সৌরবাতি গ্রামবাংলার নারীর জীবনে এনেছে প্রশান্তি। ঘরে আলোর ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না। এ কাজটি নারীরাই করতেন, তবে সৌরবিদ্যুৎ আসায় জীবন সহজ হয়েছে। এখন একটি সুইচই ম্যাজিকের মতো ঘর আলোকিত করে দেয়। মোবাইলের যুগে সৌরবাতি নিজের ঘরে ফোন চার্জের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে সৌরবাতি গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে এখনো ব্যাপক সাড়া দেয়নি। যদিও এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে কোনো কোনো পরিবার সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছে। বাগেরহাটে এক বাড়িতে এমনি এক নারীর সঙ্গে কথা হলো। তিনি সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে আয় প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলেছেন। আগে বিকালবেলা একটি টিউশনি করতেন, এখন করেন দুটো। একটি বিকালে আর একটি সন্ধ্যার পর।

গবেষণার কাজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে সুবাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে আমার আরো কিছু ধারণার সৃষ্টি হয়েছে, যা গবেষণার প্রাক্কালে অতটা স্পষ্ট ছিল না। খুলনার এক গ্রামে গেলাম। একটি গ্রামে প্রায় সব বাড়ির চাল গোলপাতায় তৈরি। আজকাল খড় বা পাতার চাল হয় না বললেই চলে। বুঝতেই পারি, এরা অত্যন্ত গরিব। কিন্তু আমি দেখছিলাম প্রায় সবার চালেই আছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। একটি ঘর দেখতে গেলাম। ভেতরে ঢুকে হতভম্ব। বাড়ির ভেতরে তেমন কোনো আসবাব নেই। একটি মাত্র বিছানা। এক বৃদ্ধ শুয়ে আছেন। অসুস্থ। অন্ধকার ঘর। সৌরবাতি কই? আলোচনায় জানা গেল, এ অন্ধকার রাতের অন্ধকার নয়। রাতে সৌরবাতি জ্বলে। কষ্ট লাগল। প্রায় ১০ হাজার টাকায় কিস্তিতে কিনেছে এ সোলার বাতি, অথচ নিজের ঘরে আর কোনো ১০ হাজার টাকা দামের সম্পদ নেই। মাসে প্রায় ৮০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। কেরোসিনের চেয়ে সস্তা। তার ওপর রয়েছে ব্যবহারের আরাম। আরামের জন্যই এ ক্রয়। মেয়েটার আরাম হয়। বৃদ্ধটি জানালেন, তার মেয়ে তার দেখাশোনা করে। অর্থনীতির ভাষায় এ আরাম বা উপযোগিতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে সোলার হোমের বাজার। প্রায় ২০ লাখ ঘর আজ আলোকিত। আরো ৫০ লাখ ঘর বাকি রয়েছে। বিশাল বাজার। প্রতি ঘরে ১০ হাজার টাকার সম্পদ বিক্রয় করা গেলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা এখনো সম্ভব।

এবার আসি দ্বিতীয় বিষয়ে। সেই চরের গল্পটির শেষ বাক্যটি বলা হয়নি। যে বাড়িতে বসে কথা হচ্ছিল, তারা সবাই চরের মাতব্বর গোছের মানুষ। বেশ অবস্থাসম্পন্ন। সঙ্গে ছিল আমার কয়েকজন ছাত্র। তারাও বেশ উত্সাহী হলো। বলল, স্যার! সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আসা যায় না? অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে ব্যবসায়ীরা কেন আনছেন না? তারাই তো তা করতে পারেন? উত্তর সবারই জানা ছিল। এরা (গরিব গ্রামবাসী) একসঙ্গে এত টাকা দিতে পারবে না। সেজন্যই কী প্রয়োজন ভিন্ন ব্যবসায়ীর— আমার প্রশ্ন। কেবল আরামের জন্য শতকরা ২০-৪০ টাকা হারে সুদে গ্রামের লোকগুলোর কাছে সৌরবিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়টি ভাবার মতো।

ফিরে আসা যাক আমাদের আলোচনায়। গ্রামবাসীর আবেদন শুনে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনারা এত দামের বিদ্যুৎ কেন কিনতে চাচ্ছেন? তারা অবাক। দাম কোথায় স্যার? সস্তা। কারণ কেরোসিনের দাম এখন অনেক বেশি। তাছাড়া মোবাইল আছে, ব্যাটারি চার্জ করা দরকার, বিদ্যুতের আলোও পরিষ্কার! ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া হয়। বুঝলাম, তারা বিদ্যুতের সব ধরনের উপযোগিতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

তাহলে আপনারা আমাদের মতো (মানে শহরের জনগোষ্ঠীর মতো) জেনারেটর কেনেন না কেন? সবাই এর-ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকলেন। পরে বললেন, জেনারেটর দিয়ে খরচ বেশি হবে। বললাম, আসুন হিসাব করি। একটি ৫০০ কেভিএ জেনারেটরের দাম ১৫ হাজার টাকা। এ দিয়ে প্রায় ৩০০ ওয়াট বিদ্যুৎ অনায়াসে উত্পাদন হবে, যা দ্বারা অন্তত ৩৫টি বাড়িতে বিদ্যুৎ দেয়া যাবে। প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা জেনারেটরটি চালালে সর্বসাকুল্যে দিনে ১০০ টাকা খরচ হবে, যা খরচ হবে, তাতে প্রতি পরিবারে দিনে চাঁদা আসবে ৩ টাকারও কম আর মাসে তা মাত্র ১৮৫ টাকা। সেসঙ্গে জেনারেটরের জন্য ৫০ টাকার কিস্তি দিলে দেখা যাবে মাত্র ২৫০ টাকা দিয়েই বাড়ি আলোকিত করা যাবে। আমার হিসাব দেখে তারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, ঘটনা সত্য, না মিথ্যা।

আমার ছাত্ররা বলল, স্যার! জেনারেটর গ্রামে এলে গ্রামের বাতাস দূষিত হয়ে যাবে। বললাম, শহরে প্রায় ১০০ ফুট অন্তর অন্তর একটি জেনারেটর চলছে। তাতে সবাই দিব্যি আছে, কেউ কথা বলছে না, কিন্তু এখানে এসবের চিন্তা কেন? মা থেকে মাসির দরদ বেশি? গ্রামবাসীকে বললাম, ভেবে দেখুন আমরা যারা শহুরে মানুষ, আমরা কিন্তু হিসাব নিকাশ করেই ব্যবস্থা নিই। আমাদের যখন বিদ্যুৎ থাকে না, তখন আমরা কেন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করি না? কারণ একটাই, সৌরবিদ্যুৎ অনেক দামি বস্তু। আপনাদের জন্য নয়। তবে হ্যাঁ, যে কারণে আপনি জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা চিন্তা করতে পারছেন না, তার মূল কারণ বিদ্যুৎ বিতরণ আইন। এ আইনে আপনি বিদ্যুৎ উত্পাদন করে বিক্রয় করতে পারেন না। ফলে একজন জেনারেটর কিনে তার উত্পাদিত বিদ্যুৎ গ্রামে বিতরণ করতে পারবে না। তাই আপনারা বাধ্য হচ্ছেন দামি বিদ্যুৎ কিনতে। ভাগ্যের পরিহাস, এসব গ্রাম বিদ্যুতের আওতায় আগামী ২০ বছরেও আসবে না বলেই কিন্তু সেখানে সৌরবিদ্যুৎ যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ কোন দেশ? বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু বিদ্যুতের আইন এখানে প্রচলিত আছে। একেই বলে ঔপনিবেশিকতা। এ আইনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

আরো কথা আছে। অনেকের ধারণা, দু-চারটা বাতির ব্যবস্থা করা হলেই হয়তোবা আমাদের গ্রাম আলোকিত হবে। তা নয়, ক্রমে আমাদের চাহিদা বাড়বে। আজ যারা দুটি বাতি পেয়েই খুশি, আগামীতে তারা আরো অধিক সংখ্যায় বাতি চাইবে। তখন এ সৌরবিদ্যুৎ অনেকটা খেলনা বস্তুতে পরিণত হবে। তাই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা টেকসই করতে হলে প্রয়োজন গ্রামভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণের দ্বার উন্মুক্ত করা। আজকাল অনেকেই মিনি গ্রিডের কথা বলছেন। তাদের মতে, মিনি গ্রিডের মাধ্যমে ছোট ছোট এলাকায় বিদ্যুৎ উত্পাদন ও বিতরণ লাভজনক করা যেতে পারে। আমার মতে, শহরে আমাদের প্রতিটি ছাদ যেন সৌরবিদ্যুেকন্দ্র হতে পারে, সেজন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ উত্পাদন আইন সংশোধন করা। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, বাসার ছাদেও বিদ্যুৎ উত্পাদন করে গ্রিডে বিতরণ করার আইন শিগগিরই করা উচিত। সৌরবিদ্যুৎ যে কারণে দামি তার মূল কারণ হলো, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। ছাদে উত্পাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে গেলে অযথা ব্যাটারির প্রয়োজন হবে। তাতে খরচ বাড়ে। তা না করে বিদ্যুৎ বিভাগ তা ক্রয় করতে পারে। তাতে দিনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিড লাইনে চলে আসবে। এর বিনিময়ে শহরবাসী পাবে বিদ্যুৎ বিলে রেয়াত। ব্যবস্থাটি এমন করা যেতে পারে, সব গ্রাহককে তার ব্যবহূত বিদ্যুতের অন্তত ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দ্বারা উত্পাদন করতে হবে। তা হলে তিনি পাবেন তার বিদ্যুৎ বিলে একটি নির্দিষ্ট হারে রেয়াত। যেমন ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ বিক্রয় করলে তার ব্যবহূত বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ কম হারে বিল হবে। ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ হলে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিলে ৩০ শতাংশ রেয়াত হবে— এ রকম। এটি উল্টোভাবেও করা যায়।  যেমন ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থাকলে বিল একই থাকবে। কিন্তু এর পর যত শতাংশ কম হবে তত শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপিত হবে। তাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সারচার্জ হবে। এর ফলে শহরবাসী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উত্সাহী হবে। তবে বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন আর বিদ্যুৎ উত্পাদন এক কথা নয়। ঢাকায় প্রতিটি ট্রাফিক সিগনালে সৌর প্যানেল আছে, কিন্তু গত বছরের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর দেখা গেল, সব ট্রাফিক লাইট বিকল। কারণ সৌর প্যানেল চলছে না। বালিতে ঢাকা! অর্থনীতির ভাষায়, শুধু প্যানেল লাগানোর সংস্কৃতি হলে তা শেষ পর্যন্ত এডভার্স সিলেকশন বা বিপথ নির্বাচনে পর্যবসিত হবে। তাই প্রয়োজন রিভার্স মিটারিং অর্থাৎ কত বিদ্যুৎ এল আর কত বিদ্যুৎ গেল (সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে গেল) তার পরিমাপ এ মিটার দ্বারা নির্ণয় করা যাবে। তাতে বাড়ির মালিকরা কেবল সৌর প্যানেল স্থাপন নয়, প্যানেল পরিচর্যা ও চালু রাখতে সর্বদা সচেষ্ট হবে। এর ফলে আমাদের ঘরের ছাদ হবে এ শতাব্দীর বিদ্যুৎ উত্পাদন কেন্দ্র। আমার মতে, শহরে সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করা উচিত।

 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

পরিচালক, এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট

 


© 2011-2015
সম্পাদক ও প্রকাশক: দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বিডিবিএল ভবন (লেভেল ১৭), ১২ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ই-মেইল: news@bonikbarta.com বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ পিএবিএক্স: ৮১৮৯৬২২-২৩, ফ্যাক্স: ৮১৮৯৬১৯
close